আহমদ ছফাকে আমি চিনেছিলাম হূমায়ুন আহমেদের এক স্মৃতিকথা পড়ে,সেখানে ছফার সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব আমাকে আকর্ষণ করে,যে মানুষ হুমায়ুনকে লেখার জগতে আনল,একটা শহীদ পরিবারকে ঘরছাড়া করেছে তার প্রতিবাদে তিনি নিজের শরীরে কেরোসিন ঢেলে দিচ্ছেন,অনুভব করি মানুষটার মাঝে অসাধারণ কিছু আছে!

ছফার প্রথম বই পড়েছিলাম “ওঙ্কার”, মাত্র ২৭ পৃষ্ঠায় কিভাবে একটি উপন্যাসকে তিনি ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সমান্তরালে এনে দাঁড় করালেন,কিভাবে একটি বোবা মেয়েকে দিয়ে তিনি এক রাষ্ট্রের নবজাগরণের গল্প লিখলেন তা অনবদ্য একটি ব্যাপার!আসলে এই বইটি পড়ার পর আমি বুঝতে পারি আহমদ ছফা অন্য কিসিমের মানুষ,ইনি আমাদের চারপাশে থাকা আর বাকি পাঁচটা লেখকের মতো নন!

আহমদ ছফার জীবনে শ্রেষ্ঠ কাজ মনেহয় ” বাঙালি মুসলমানের মন”।সম্ভবত তিনিই প্রথম বাঙালি লেখক যিনি বাঙালি মুসলমানদের দিকে বিদ্বেষ,তাচ্ছিল্য কিম্বা অতিউৎসাহের দৃষ্টিতে নয়,তাদের দিকে তাকিয়েছিলেন নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে।কিভাবে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাভাবনা তাদের আদি উৎস দ্বারা প্রভাবিত,কিভাবে চিন্তার দৈন্যতা তাদেরকে পশ্চাদপর করছে তার ব্যাখা দিয়েছেন।এই ব্যাখার সাথে কারো দ্বিমত থাকতেই পারে,কিন্তু তিনি যেভাবে অনুভূতিতে আঘাত না করে সত্য কথাটি বলে ফেললেন,তা আমাদের সাহিত্যিক সমাজে বিরল!
ছফার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো “বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস”।এ বইয়ের প্রেক্ষাপট ছিল কিভাবে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সাহিত্যিকেরা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা পালন না করে ক্ষমতা আর অর্থের মোহে নিজেদের বিবেককে বিসর্জন দিচ্ছেন এবং কিভাবে দেশের কল্যাণকে ব্যাহত করে বিভিন্ন ব্যক্তি,প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মকাণ্ডের পরিচালনা করছেন এবং এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় কি তা নিয়ে।ছফার লেখার একটি খুব সুন্দর দিক রয়েছে,তিনি যখন কোনোকিছুর সমাধান দেন তখন সেই সমাধানটাই যে আবশ্যক সেটা বলেননা বরং বাস্তব প্রেক্ষাপটে তার অবস্থান কোথায় এবং সমস্যার সমাধানকে কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে সে সম্পর্কে তার মতামত দেন,এ জন্যেই আহমদ ছফা বর্তমান সময়েও অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক,তার লেখা পড়লে মনেহয় সেই ১৯৭২ এ তিনি লিখে গেলেন আর তার কথাগুলো এখনো ঘটে যাচ্ছে,এ যেন ভবিষ্যৎবাণীর মতো,আশ্চর্য রকমের সত্য কিছু!

আমার লেখাটুকু পড়লে মনেহবে আমি হয়তোবা ছফার কোনো গুণমুগ্ধ পাঠক,বিষয়টা আসলে সেটা না।লেখকের সাথে পাঠকের আইডিওলজিতে দ্বন্দ্ব থাকবে এটাই চিরকালীন সত্য,কিন্তু লেখক যখন পাঠকের জীবনের সাথে মিলেমিশে যান,তার সমাজ নিয়ে কথা বলেন,তার দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলোকে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে ওঠেন,তখন লেখককে নিজের মানুষ মনেহয়,তার লেখাকে সর্বকালীন মনেহয়।তাইতো নিজের অসহায়ত্ব জেনেও মাঝেমাঝে নিজেকে আলী কেনানের মতো শক্তিশালী মনে হয়,নিজের সবকিছু থেকেও ফজলে এলাহীর মতো অসহায় বোধ হয়!

আমার খুব মন খারাপ হয় যখন দেখি পপুলার মিডিয়ায় ছফাকে নিয়ে আলোচনার পরিমাণ কম,সবাই যেন তাকে পাশ কাটায় যায়।আমার প্রশ্ন হইল কতদিন তাকে এড়ায় যাবেন?তার লেখার যে শক্তি একদিন তা গণমানুষের দুয়ারে এসে কড়া নাড়বেই,সবাই একদিন সত্যগুলো জানবেই,সেদিন মুখ লুকোনোর জায়গা পাবেন?

[সাহেদ হোসেন‎ to বইপোকাদের আড্ডাখানা (Boipokader Addakhana)]

আহমেদ ছফা

Showing all 2 products

Sort by