দেয়াল – হুমায়ুন আহমেদ ( Deyal By Humayun Ahmed)

(8 customer reviews)
  • জ্ঞান হোক উন্মুক্ত

    আমরা বিশ্বাস করি, জ্ঞানপ্রাপ্তির অধিকার রয়েছে সবার ।
  • এটি লাইব্রেরীর ডিজিটাল ভার্সন ব্যতীত অন্য কিছু নয়

    লাইব্রেরীতে গিয়ে সবাই যেমন বই পড়ে, তেমন ভাবে এখানেও পড়বে।
  • উন্নততর প্রযুক্তি

    আমাদের লাইব্রেরীতে থাকা বই ডাউনলোড যোগ্য নয়, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বইগুলো কেবলমাত্র পড়ার জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
  • এই লাইব্রেরীতে দেয়া বই, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারযোগ্য নয়

    যেহেতু লাইব্রেরীতে দেয়া বই কেবলমাত্র পড়ার জন্য, কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের দায় বুকশেলফ এর উপর বর্তাবে না।
  • বই ডাউনলোড যোগ্য নয়

    এই লাইব্রেরীতে দেয়া বই ডাউনলোড করার উপযোগী নয়।
5.0/5
8 reviews
8
0
0
0
0
  1. Wasim Subhan Choudhury

    যখন মধ্যাহ্ন উপন্যাসে পড়ি যে কাঠমিস্ত্রি সুলেমানের রূপবতী স্ত্রী জুলেখা তালাকের পর আশ্রয় নেয় বেশ্যাপল্লীতে এবং পরে কলকাতায় গিয়ে সুকণ্ঠি গায়িকা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে তখন জানতে ইচ্ছে হয় এই চরিত্র কি বাস্তবে ছিল নাকি লেখকের কল্পনা থেকে এসেছে। ধন্ধে পড়ি কারন উপন্যাসে এক সময় এসে হাজির হন জোড়াসাঁকোর জমিদার পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যিনি গান লেখেন, সুর দেন! উপন্যাসে আরও হাজির আছেন নেত্রকোনার উকিল মুন্সী যাকে ১৯৯৪ সালে ‘যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ’ উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছিলেন হুমায়ুন আহমেদ; ২০০০ সালে শ্রাবণ মেঘের দিনে সিনেমাতেও বারী সিদ্দীকীর কন্ঠে হুমায়ুন আহমেদ ব্যবহার করেছিলেন উকিল মুন্সীর তিনটি গান। অন্য এক জায়গায় উপস্থিত হন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ইতিহাস থেকে উঠে আসা চরিত্রগুলো চমৎকার ভাবে মিশে যায়।

    হুমায়ুন আহমেদের দেয়াল উপন্যাসেও অহরহ উঠে আসে পরিচিত চরিত্র – বঙ্গবন্ধু; তার খুনী ফারুক, রশিদ; জিয়াউর রহমান, খালেদ মশাররফ, তাহের। মধ্যাহ্ন উপন্যাস প্রথম পর্যায়ে আবর্ত হয়েছে ব্যবসায়ী হরিচরণ সাহাকে নিয়ে যিনি এক মুসলমান বালককে আদর করার দোষে সমাজচ্যুত হন এবং পরবর্তীতে ঋষিসুলভ জীবন বেছে নেন। এটি সেই অর্থে ঐতিহাসিক উপন্যাস নয় কারন কোন গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়নি যদিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বর্ণনা এসেছে। বরং এখানে উঠে এসেছে বিংশ শতাব্দীর বাংলা। অপরদিকে দেয়াল উপন্যাসে উঠে এসেছে একটা নির্দিষ্ট সময় / বিষয় – মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। মধ্যাহ্ন উপন্যাসে ধারাবাহিকতা রয়েছে কিন্তু দেয়াল একটু ছন্নছাড়া।

    দুইটি উপন্যাসেই পাঠকের মনোরঞ্জনই গল্পকারের প্রধান লক্ষ্য, এবং তিনি দুর্দান্ত ভাবে সফল। তবে মধ্যাহ্ন উপন্যাসে দেখি কিছু অতিলৌকিক ও আধিভৌতিক ঘটনা এসেছে যার কোনটাই অবাস্তব লাগে না; দেয়াল উপন্যাসে সবই লৌকিক কিন্তু তাও কিছু কিছু দৃশ্য বাস্তব লাগে না। মধ্যাহ্ন উপন্যাসে একটা বিশাল পরিসরে লেখক ধর্ম, বর্ণ ও জাতের বিভেদ তুলে ধরেছেন বিশদ ভাবে; দেয়াল উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু হত্যা, কারাগারে চার নেতা হত্যা, কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী-জনতার বিপ্লব, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতাগ্রহণ এবং তাহেরের ফাঁসি তুলে ধরেছেন অল্প পরিসরে।

    দেয়াল উপন্যাসে প্রথমদিকে হুমায়ূন আহমেদ গল্পকার হয়ে প্রথমপুরুষে কাহিনী বলেছেন। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ নিজের মন্তব্য দিয়ে বসেছেন এমন ভাবে – আমি ব্যক্তিগতভাবে এই খেলা বুঝার আশায় দিয়েছি জলাঞ্জলি। ১৫ আগস্টের কাহিনী চলার সময় তিনি লিখে বসেন – আমার বাবর রোডের বাসার কথা বলি। তারা, এরা, শফিক, অবন্তীদের গল্পে হঠাৎ তার নিজের ব্যক্তিগত মন্তব্য পড়ে আমার ধাক্কা লেগেছে। ধাক্কা লেগেছে কিছু কিছু জায়গায় কাহিনী বলা থামিয়ে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন খবরের কাগজের বিবরনের মতো।

    হুমায়ুন আহমেদ দেয়াল উপন্যাসের শেষে গ্রন্থপুঞ্জি দিয়েছেন যেখানে ৩০টি বইয়ের নাম দেয়া আছে। তারপরও উপন্যাসটিতে বেশ কিছু তথ্যগত অসামঞ্জস্য রয়েছে। উপন্যাসের এক জায়গায় হুমায়ূন আহমেদ বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুকের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের বেশ বড় একটা বর্ণনা করেছেন। কিন্তু এই ফারুক সেই অর্থে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের প্রায় সবসময়ই সে বাইরে কাটায়। ভারতে ঢোকে ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষদিকে। দিল্লিতে কিছুদিন থাকে সে, তারপর ভারত প্রশাসন তাকে কলকাতা পাঠিয়ে দেয়। ফোর্ট উইলিয়ামে কিছুদিন থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সে বাংলাদেশে ঢুকে। দেশ স্বাধীন হয় ১৬ তারিখ। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল আর্মি অফিসারকে দু’বছরের জ্যেষ্ঠতা প্রদান করেছিল; ফারুক জ্যেষ্ঠতা পায়নি। আবার খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের কথা বর্ণনা করার সময় এক জায়গায় হুমায়ুন আহমেদ লেখেন যে খালেদ মোশাররফ ৩ তারিখ বিকাল তিনটায় জেলহত্যার খবর পেলেন। তিনি আরো লেখেন যে সময় ফারুক-রশীদ-ডালিমদেরকে নিয়ে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইট ব্যাংককের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় ঠিক সেই সময় খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবনে ঢোকেন প্রেসিডেন্টে খন্দকার মোশতাকের সাথে দেখা করবার জন্য। গ্রন্থপুঞ্জিতে উল্লেখিত ত্রিশটি রেফারেন্সের কোথাও এই তথ্যগুলো এভাবে বলা হয়নি। প্রকৃতভাবে খালেদ মোশাররফ বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন যখন ফারুক-রশীদ-ডালিমদের নিয়ে বিমানটি উড়ে যায় ব্যংককের উদ্দেশ্যে। খুনিদের দেশত্যাগ নিশ্চিত করেই খালেদ মোশাররফ বঙ্গভবনে যান আর জেল হত্যার ব্যাপারে তিনি জানতে পারেন পরের দিন অর্থাৎ ৪ নভেম্বর সকালে। হুমায়ুন আহমেদ কোন তাগিদে এই তথ্যগুলো এমন ভাবে পরিবেশন করলেন তা বোধগম্য নয়। আর একটি ভুল বিষয় চোখে লাগে তা হলো নভেম্বরের খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সময়কার কাহিনীতে তিনি ফারুক ও রশিদ
    দুইজনকেই ‘মেজর’ বলে উল্লেখ করেছেন কিন্তু তারা দুইজনই তখন লেফট্যানেন্ট কর্ণেল।

    তথ্যত্রুটি ও ধারাবাহিকতার অভাবকে পাশে সরিয়ে রাখলে দেয়াল উপন্যাসটিও হয়ে উঠে অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি বই। অন্যদিকে মধ্যাহ্ন বইটির ঘটনাপ্রবাহের ওপর হুমায়ূন আহমেদের অসাধারণ নিয়ন্ত্রন আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছে পুরোটা সময়। বোধকরি এখানে হুমায়ুন আহমেদ তার লেখনীর জাদু ফোটানোর সুযোগ ও স্বাধীনতা পেয়েছেন বেশী। চরিত্রগুলোর কথোপকথনে ও সংলাপে, হোক না সে ইতিহাস থেকে উঠে আসা কেউ, চমৎকার করে কথা বসিয়েছেন। সংলাপ গুলোই অনেক সময় উপন্যাসগুলোর মূল আকর্ষণ হয়ে উঠে, অতি সাধারণ দৃশ্য হয়ে উঠে মনোহর।

    পার্থক্য থাকলেও দুইটি উপন্যাসই সুখপাঠ্য।

  2. Soumik Akonjee

    (দেয়াল – হুমায়ূন আহমেদ)

    হরিদাসের চুল কাটার দোকান
    সোবহানবাগে , ধানমন্ডি ৩২
    নাম্বারের কাছেই। দোকানের
    বাইরে সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রেখেছে
    “ শেখের বাড়ি যেই পথে, আমার সেলুন
    সেই পথে”! তবে সে কাস্টমারের দৃষ্টি আকর্ষণের
    জন্য এই সাইনবোর্ড লাগায়নি। তার
    মনে ক্ষীণ আশা – এই সাইনবোর্ড একদিন
    বঙ্গবন্ধুর নজরে আসবে; তিনি গাড়ি থামিয়ে নেমে আসবেন। গম্ভীর গলায় হাঁক ছাড়বেন – “কি সব
    ছাতা মাথা লিখেছিস, কি নাম তোর?
    দে আমার চুল কেটে দে। তারপর
    বিনা তেলে মাথা মালিশ।” বঙ্গবন্ধুর পক্ষে এ ধরণের কথা বলা মোটেই অস্বাভাবিক না, বরং স্বাভাবিক।
    সাধারণ মানুষের সাথে তিনি এমন
    আচরণ করেন বলেই তার নাম বঙ্গবন্ধু।

    ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫।
    শেষ রাতে ভীষণ শব্দে হরিদাসের ঘুম
    ভেঙে গেল। তার মনে হলো ভুমিকম্প
    হচ্ছে। দৌড়ে দোকান থেকে বের
    হয়ে হতবাক। এ কি? তার দোকানের
    সামনে আলিশান এক ট্যাঙ্ক। ট্যাঙ্ক
    পেছনের দিকে রিভার্স করছে মুখ
    ঘোরানোর জন্য, তার দোকানের দিকেই
    আসছে। কঠিন কিছু কথা বলার জন্য
    নিজেকে তৈরী করলো সে, কিন্তু একটু পরেই
    ট্যাঙ্কের পেছনের ধাক্কায় তার
    দোকান তার ওপরেই ভেঙে পড়লো! ১৫
    আগস্ট হত্যাকান্ডের সুচনা হলো হরিদাসের
    মৃত্যুর মধ্য দিয়ে!

  3. মোহাম্মদ খালিদ সাইফুল্লাহ ফয়সল

    বই পর্যালোচনা (রিভিউ): ১৭
    বইয়ের নামঃ দেয়াল
    লেখকঃ হুমায়ূন আহমেদ
    ভাষাঃ বাংলা
    ঘরনাঃ ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক উপন্যাস
    বইয়ের পৃষ্ঠাঃ ১৯৮
    মূল্যঃ ৩২৩ টাকা
    প্রকাশনীঃ অন্যপ্রকাশ
    ব্যক্তিগত অনুযোগ (রেটিং): ৪/৫

    “মানুষ ও পশু শুধু যে বন্ধু খোঁজে তা না, তারা প্রভুও খোঁজে,” “সবাই চোখ কান খোলা রাখে, আমি নাকও খোলা রাখি,” “মানবজাতির স্বভাব হচ্ছে সে সত্যের চেয়ে মিথ্যার আশ্রয়ে নিজেকে নিরাপদ মনে করে!”

    পুরো উপন্যাসের তিনটি বেশ ভাবগাম্ভীর্যপূরক শব্দগুচ্ছ, যেখানে মানবসত্তার, ব্যক্তিসত্তার প্রাচীন রূপ, চরিত্রের দৃশ্যপট বাস্তবে রূপ পেয়েছে। আর, এটিকে বাস্তবতায় রূপ দিয়েছেন জনপ্রিয় লেখক ও কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ।

    তবে, এই বইটি, দেয়াল, দেশের ক্ষমতার মসনদে থাকা ব্যক্তিদের লাল কলমের আঁচড় খেয়ে নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়েছে।

    বইয়ের শুরু……

    ‘ভাদ্র মাসের সন্ধা। আকাশে মেঘ আছে। লালচে রঙের মেঘ। যে মেঘে বৃষ্টি হয় না, তবে দেকায় অপূর্ব। এই গাঢ় লাল, এই হালকা হলুদ, আবার চোখের নিমিষে লালের সঙ্গে খয়েরি মিশে সম্পূর্ণ অন্য রঙ। রঙের খেলা যিনি খেলছেন মনে হয় তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন।’ এভাবে সূচনা ঘটেছে হুমায়ূন আহমেদের চার দশকের বর্ণময় লেখকজীবনের শেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’- এর।

    উপন্যাসের শুরুতে আকাশের রঙবদলের খেয়ায় যে সিদ্ধান্তহীনতার কথা বলা হচ্ছে তা বিশেষ ইঙ্গিতবহ। যে সময়কে উপজীব্য করা হয়েছে ‘দেয়াল’-এ, তা একটি সদ্যস্বাধীন জাতির ভাগ্যকাশের চরম অনিশ্চয়তার কাল। লেখক যেহেতু উপন্যাস লিখেছেন, তাই আছে কিছু কাল্পনিক চরিত্র। গল্প আবর্তিত হয়েছে এদের ঘিরেও।

    নানা ঘটনার ঘনঘটায় ঢাকা পড়ে নি জীবনসৌন্দর্য আর জীবন-সত্যের সন্ধান। ইতিহাসের সত্য আর লেখকের সৃজনী ভাবন্য-দুইয়ে মিলে ‘দেয়াল’ পরিণত হয়েছে একটি হৃদয়গ্রাহী উপাখ্যানে।

    আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এসব শোকাবহ পর্বের বর্ণনায় যে-পরিসর ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল, বইতে তা দেওয়া হয় নি। বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে অনুবস্ত্রের অভাব এবং রক্ষী বাহিনীর অত্যাচার ও তাদের প্রতি সর্বসাধারণের ক্ষোভ ও ঘৃণার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ মুজিবকে বঙ্গপিতা, মহামানব ও বঙ্গবন্ধু বলা হলেও মৃত্যুতে তিনি লেখকের অতটা সহানুভূতি লাভ করেননি যতটা পেয়েছেন তাঁর পরিবারের শিশু ও নারীরা।

    অবন্তির গৃহশিক্ষক শফিক, যে নিজেকে খুবই ভীতু বলে পরিচয় দেয়, সে-কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘মুজিব হত্যার বিচার চাই’ চলে স্লোগান দেয়, গ্রেপ্তার হয় এবং নিপীড়ন সহ্য করে। খন্দকার মোশতাককে এ-বইতে সঠিক চরিত্ররূপে অঙ্কন করা হয়েছে।

    ‘অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম খালেদ মোশাররফ’ এবং ‘মহাবীর কর্নেল তাহেরে’র প্রতি লেখকের শ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে এবং উপন্যাসে কর্নেল তাহেররকেও দেখিইয়েছেন খালেদ মোশাররফের সাহসিকতা ও চরিত্রগুণের প্রশংসা করতে!

    জিয়াউর রহমানের আর্থিক সততার প্রশংসা আছে, জনগণের শ্রদ্ধা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা বলা হয়েছে, সেই সঙ্গে তাঁর ক্ষমতালোভের কথা বলা হয়েছে এবং সরকারি তথ্য উদ্বৃত করে জানানো হয়েছে যে, ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর গঠিত সামরিক আদালতের বিচারে ১১৪৩ জন সৈনিক ও অফিসারকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিতে হয়েছে!

    অনেক মিথ্যের আড়ালে সত্য গুটিসুটি হয়ে জমে যায়, হেলে যায়, পড়ে যায়।

    লেখকের মতে, এদের দীর্ঘনিশ্বাস জমা হয় চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে- সেখানে ‘জিয়া প্রাণ হারান তাঁর এক সময়ের সাথী জেনারেল মঞ্জুরের পাঠানো ঘাত বাহিনীর হাতে।’ এই সিদ্ধান্তের সমর্থনে বইতে কোনো তথ্য নেই, বরঞ্চ এই হত্যাকাণ্ডের পশ্চাতে মনজুরের ‘রূপবতী স্ত্রী’র প্রলয়ংকরী স্ত্রীবুদ্ধি কাজ করে থাকতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।

    বঙ্কিমচন্দ্র যে বলেছিলেন, ‘উপন্যাস ইতিহাস নহে’, সে কথা যথার্থ। তবে ইতিহাসাশ্রিত উপন্যাসে ইতিহাসের সারসত্য অবিকৃত থাকবে বলে আশা করা হয় এবং কল্পনাপ্রসূত আখ্যানেও কার্যকারণ সম্পর্কের ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত। দেয়াল উপন্যাসের প্রথমদিকে হুমায়ূন আহমেদ নিজের উল্লেখ করেছেন প্রথম পুরুষে, শেষদিকে এসে উত্তমপুরুষে নিজের কথা সে বলে গেছে।

    নিজের ব্যক্তিগত পাঠ প্রতিক্রিয়ায় বলবো যে, পুরো বইটি লেখক কাল্পনিক চরিত্র দিয়ে লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে দেশের ক্ষমতার মসনদে যে পরিবর্তন আসে, তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ’৭১ এর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, মা-বোনের উপর অসহনীয় অত্যাচার।

    মুক্তিযুদ্ধ সম্বন্ধে কতটুকু বা জানি আমরা?

    কতটুকু জানে বাঙালি?

    তরুণ প্রজন্মের কাছে এর প্রভাব কতটুকু?

    এমন কিছু প্রশ্ন আছে যাদের উত্তর কুয়াশার মত। দূর থেকে আবছা শুধু দেখা না, সেগুলোকে ধরা বা ছোঁয়া যায় না।

    বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এর মূল উপজীব্য। লেখক এখানে বঙ্গবন্ধুর শাসনামল, বাকশাল গঠন, রক্ষী বাহিনীর কার্যক্রম, হত্যা পরবর্তী প্রতিক্রিয়া, জেল হত্যা, এবং এসব ঘটনায় মেজর রশীদ, মেজর ফারুক, খন্দকার মোশতাক প্রমুখের ভূমিকার স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন।

    পাশাপাশি খালেদ মোশাররফের ক্যু, মেজর জিয়াউর রহমানের আটকাবস্থা, কর্নেল তাহেরের অভিযান, সেনাবাহিনীর অফিসার থেকে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা জেনারেল জিয়ার কথা, তাহেরেরে ফাঁসি, রাষ্ট্রনায়ক জিয়ার শাসনামল, উনার শাসনামলে বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক ইত্যাদি আলোচনা করেছেন লেখক।

    আর এই সমস্যা থেকে রক্ষা করার জন্য আলো হাতে এগিয়ে এসেছেন অনেক কবি লেখক আর গন্যমান্য ব্যক্তিরা। তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধকে করতে ছেয়েছেন আপন আলোয় আ্লোকিত। হুমায়ুন আহমেদ তাদের একজন। তিনি যেমন বলেছেন একাত্তরের কখা তেমনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন ১৯৭৫ এর ষড়যন্ত্র এবং রক্তঝরা নভেম্বরের কথা।

    চরিত্রের খেয়ালিপনা, সংলাপের সংঘাত, ঘটনার আকস্মিকতা ও কার্যকারণহীনতা আমাদের সবসময়ে রহস্যময়তার দিকে আকর্ষণ করে নিয়ে গিয়েছে, তাই বাঙালি জাত্তিসত্তায় বিশ্বাসী, সাহিত্যপ্রেমী সবাইকে দেয়াল বইটি পড়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি……

  4. Syed Ehsanul Karim

    বই : দেয়াল
    লেখক : হুমায়ুন আহমেদ
    প্রকাশনী : অন্যপ্রকাশ পাব্লিকেশন্স
    মুদ্রণ মূল্য : ৩৮০ টাকা

    এই উপন্যাসে যেমন আছে অবন্তী নামের এক প্রচলনবিরোধী মেয়ের কাহিনি তেমনি আছে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বঙ্গবন্ধুকে হত্যার এবং তারপর রাজনৈতিক সহিংসতার অতঃপর মেজর জিয়াউর রহমানকে হত্যার ইতিহাস।
    উপন্যাস উপন্যাসই হয়, ইতিহাস হয় না। অথচ হুমায়ুন আহমেদ এই বইয়ে অত্যন্ত চতুরতায় এক ইতিহাস বর্ণনা করে গেছেন উপন্যাসের আড়ালে।
    ‘দেয়াল’ প্রকাশের আগেই এই বই নিয়ে কোর্ট-কাছাড়ি হয়। অতঃপর অনেক পরিমার্জিত করে তা প্রকাশ করা হয়। বইটিতে ঐতিহাসিকতা প্রমানের জন্য হুমায়ুন আহমেদ অনেক দলিল দস্তাবেজের রেফারেন্স দিয়েছেন। কিন্তু তার পরেও সমালোচকদের মতে তা নাকি ত্রুটি পূর্ণ।

    হুমায়ুন আহমেদের জীবনের শেষ উপন্যাস দেয়াল। এই বইটি লেখতে উনাকে প্রায় ৩০ টির বেশি বইয়ের সাহায্য নিতে হয়েছে। যুদ্ধপরবর্তী অনেক কথা জানতে পারা যায় এই বই থেকে। আমি হুমায়ুন স্যারের সৃষ্টিগুলোর লিস্টে উপরের দিকেই রাখছি ‘দেয়াল’কে।

  5. Abid Alam

    দেয়াল
    হুমায়ূন আহমেদ

    প্রচ্ছদে লেখা ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষ উপন্যাস’ লেখাটা দেখেই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। মনে হলো যে আর বইমেলাতে লেখকের বই কিনা নিয়ে ভিড় থাকবে না তার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য লাইনে দাড়াতে হবে না।

    লেখক নেই, তবে তার লেখা গুলো রয়েছে। তার সৃষ্টি করা চরিত্র ‘হিমু’ ‘মিসির আলি’ ‘শুভ্র’ ‘রুপা’ সকলের মনে জীবিত থাকবে আজীবন। এইসব চরিত্রের মাঝেই হয়তো খুঁজে পাবে প্রিয় লেখকের অস্তিত্ব।

    অনেকেই আছেন যারা কখনো বই পড়ে নি তারাও যদি ১/২টি বই পড়ে থাকেন তা ছিলো হুমায়ূন আহমেদের। এইখানে ছিলো লেখকের জাদু। তার বইগুলো এমনভাবে লিখা ছিলো যে কেউ অর্ধেক পড়ে উঠতে পারবে না।

    ‘দেয়াল’ বইটি নিয়ে আর কি বলবো, তা আপনারা পড়েই বুজতে পারবেন। আমি না হয় প্রিয় কিছু লাইন দিয়ে দিলাম আপনাদের জন্য পেশ করলাম :-

    ১.বাথরুম হলো নিজেকে বিছন্ন রাখার আর্দশ স্থান

    ২.মেয়েদের স্বভাব হচ্ছে গোপন করা

    ৩.শ্রোতা যতো ভালো হয়, গল্প ততো জমে

    ৪.অতি রুপবতীদের কারো প্রেমে পড়তে নেই

    ৫.হাতের রেখায় মানুষের ভাগ্য থাকে না, ভাগ্য থাকে তার কর্মে

    ৬. এই পৃথিবীতে মূল্যবান শুধু মানুষের জীবন, বাকি সব মূল্যহীন

    ৭.কিছু রহস্য মানুষ মৃত্যুর সংগে নিয়ে চলে যায়

    ৮. মানুষ একমাত্র প্রাণী যে পুরোপুরি সফল জীবন পার করার পরেও আফসোস নিয়ে মৃত্যুবরণ করে।

    আসুন বেশি বেশি বই পড়ি, পৃথিবীকে বানিয়ে ফেলি গ্রন্থগ্রস্ত পৃথিবী।

  6. Mohammad Shariful Islam

    দেয়াল
    হুমায়ূন আহমেদ
    সংক্ষেপে :
    বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম দিক পরিবর্তনকারী সময় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।বলতে গেলে পুরো নভেম্বর আর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহই পুরো বাংলাদেশের ইতিহাস পরিবর্তন করে দেয়।কিন্তু নানা কারনে এই সময়টা ভীষণ বিতর্কিত।তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই সময় নিয়ে লিখিত বইয়ের সংখ্যা খুবই কম।সেই কাজটিই দারুণ দক্ষতায় নিজের স্টাইলে করেছেন জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন অাহমেদ।ইতিহাস আর কল্পনা মিশিয়ে নিজের জীবনের শেষ বই হিসেবে লিখে ফেলেন এই বইটি।একদিকে অবন্তি-শফিক আর জাহাঙ্গীর আর অন্যদিকে সেনা কর্মকর্তা,চার নেতা, শেখ মুজিব,কর্ণেল তাহেররা।দুইটি কাহিনিই সমান্তরালে চলেছে আর তাদের মধ্যে তো সংযোগ ছিলই।মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনির বর্বরতা,স্বাধীনতা, শেখ মুজিবের শাসনামল, বাকশাল আর রক্ষী বাহিনি,শেখ পরিবারের হত্যা,খন্দকার মোশতাকের ক্ষমতালাভ,সিপাহি বিদ্রোহ, জিয়ার ক্ষমতালাভ,কর্ণেল তাহেরের বিচার, জিয়ার হত্যাকান্ডসহ ঐসময়ের সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা স্থান পেয়েছে বইটিতে।একদিকে যেমন বইটাতে সমালোচনা করেছেন শেখ মুজিবের বাকশালের ঠিক তেমনি সমালোচনা করেছেন জিয়ার অন্যায় বিচারেরও।আর অন্যদিকে অবন্তি আর শফিকের কাহিনিও এগিয়েছে লেখকের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে।
    পাঠ প্রতিক্রিয়া :
    মূলত লেখকের শেষ বই হিসেবেই বইটা পড়া শুরু করা।তারপর বলতে গেলে এক বসাতেই শেষ করেছি।কেবলমাত্র ইতিহাসের ঐ অংশটুকু বইটিতে আসলে একটা সম্ভবনা ছিল বিরক্ত লাগার কিন্তু দুইটা সমান্তরাল ঘটনার অবতারণা করে লেখক বইটিকে অনেক আকর্ষণীয় করে তুলেছেন।অন্যদিকে বইটিকে নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক বইটিকে আরো পাঠকপ্রিয় করেছে।আর বইয়ের শেষে রেফারেন্সগুলো বইটিকে ঐতিহাসিকভাবে আরো গ্রহণীয় করেছে।

  7. Parvin Pari

    হুমায়ূন স্যারের বইয়ের লেখা গুলো কেন জানি খুব ভালো লাগে পড়তে। পড়া বই গুলো আবার পড়ছি। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের মধ্যে “দেয়াল” অন্যতম। এছাড়াও প্রেমের গল্প, নক্ষত্রের রাত এই নিয়ে চারবার পড়লাম। কেন পড়লাম নিজেও জানি না। এতো বার পড়েছি তবুও একবারে জন্য মনে হয়নি পড়ে ক্লান্ত হয়ে গেছি। বরং মনে হয় বার বার পড়ি।
    পুরোনো বই গুলো আবার পড়তে ইচ্ছে করছে। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের বই গুলো যতবার পড়েছি মনে হয়েছে গল্পের শেষে মূল কাহিনীর একটা রেশ রয়েই যায়। স‍্যার আজো খুঁজে বেড়ায় আপনার ভক্তরা আপনার রেখে যাওয়া বইয়ের গন্ধে।

    ভালো থাকুন স‍্যার।
    দোয়া ও ভালোবাসা সব সময়।

  8. Shah Shaifullah Al Zakerin

    হুমায়ন আহমেদের সব বই পড়া হলেও “দেয়াল” টা পড়া হচ্ছিলো না। নিজেও পড়তে চাইতাম না কারণ আমার অন্যতম প্রিয় লেখকের হাত দিয়ে ইতিহাসের কোন বিকৃতি ঘটলে তা মেনে নেয়া কঠিন হবে। এইবার ছুটিতে চোখের সামনে বইটা দেখতে দেখতে পড়া শুরু করেই ফেললাম। কাহিনীকে কেন্দ্র করে সত্য ইতিহাসকে তুলে নিয়ে আসা অনেক কঠিন কিন্তু অনেক সমালোচনা আর পরিমার্জনের পর বইটা এক কথাতে চমৎকার হয়েছে। ইতিহাসকে ইতিহাসের পথেই চলতে দেয়া হয়েছে আবার উপন্যাস যেনো উপন্যাসের পথেই চলেছে। ৭৫ এর ১৫ ই আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর কি হয়েছে, ওই সময়ে কতগুলো ক্যু হয়েছে, ৭৫-৭৮ এ কেনো প্রায় ১২০০ সেনা অফিসারকে খুন করা হলো, প্রায় ২৪ ঘন্টা শেখ মুজিবের লাশের পরে থাকা, খালেদ মোশাররফের মতো একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং সেনা অফিসারের মৃতদেহের রাজপথে পরে থাকা, রক্ষী বাহিনীর ইউ টার্ণ কিংবা আসোল আওয়ামীলীগারদের সড়িয়ে ফেলে কিছু ভুয়া আওয়ামীলীগারের উঠে আসা সবকিছুর চমৎকার বর্ণনা। আমি ইতিহাসবিদ না, কিন্তু ইতিহাসের যতটুকু জানি সেই হিসেবে মনে হয়েছে বইটি প্রকাশের পূর্বে কোর্টের হস্তক্ষেপে কিছু ছোট খাটো পরিবর্তন হওয়ার পরও বইটা ইতিহাসের একটা সহজবোধ্য দলিলে পরিণত হয়েছে।
    বর্তমান সরকারের সময়ে বইটি প্রকাশিত হলেও কাওকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরা হয় নি বলেই মনে হয়েছে।
    আমার চোখে “জননী এবং জোস্ন্যার গল্প” এর মতোই “দেয়াল” কেও একই সাড়িতে রাখা যায়।

Add Your Review